রাইডার্সপেন

টর্চের আলোতে সর্পিল বান্দরবন-নীলিগিরি বাইকট্যুর

বাইকট্যুর কাহিনী লিখছি রাইডার্সপেন এর জন্য। যখন বান্দরবন শহরে পৌছাই ততক্ষণে ঘড়ির কাটায় ৩টা বেজে ৩৫ মিনিট। এরপর তড়িঘড়ি করে একটা হোটেলে ঢুকে দুপুরের খাবার খেতে বসে পড়লাম। আর তখনই ঠিক বাজপড়ার মত কথাটি শুনলাম। নোমান ভাই বলল যা খাওয়ার বেশি করে খেয়ে নে। রাতে কপালে খাবার নাও জুটতে পারে। আমি ত ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। এর আগে অনেক রাইড দিয়েছি, কিন্তু এত পাঘলামি কখনো হয় নাই। জানিনা সামনে কি অপেক্ষা করছে?

যাই হোক, খাওয়া দাওয়ার পর বিকাল ৪:৩০ এর দিকে রুমা বাস স্ট্যান্ড এর দিকে আগাতে লাগলাম। পরে বাস স্ট্যান্ড থেকে স্যালাইন ও পানি নিয়ে সামনে আগাতে লাগলাম। কিছুদূর গিয়েই অবশ্য পানি বিসর্জন এর জন্য থামতে হলে।শুরুর দিকের আপহিলগুলো খুব প্যারা দিচ্ছিল, যদিও আমরা দুইজনের কেউই গায়ে মাখছিলাম না। কারণ চাচ্ছিলাম দিনের আলোতে যতদূর সম্ভব কাভার করা যায়। আমাদের প্রাথমিক টার্গেট ছিল নীলগিরি। পথে মিলনছড়ি চেকপোস্ট অতিক্রম করে গেলাম কিছুক্ষণ পরেই,কিন্তু থামলাম না। শৈলপ্রপাত এর ডাউনহিলটা খুব দ্রুতই নেমে আসছিলাম। কিন্তু বাধ সাধল নোমান ভাই। পেছন থেকে ডাক দিল। আমি ভাবলাম কোন সমস্যা হয়ছে উনার সাইকেলে। কিন্তু উল্টো ঘুরে গিয়ে দেখি না, পেয়ারা আর কলা থেকেই উনি থেমেছে। কিছু পেটে দিলাম আর কিছু ব্যাগে নিলাম। আর এখানেই প্রথম ছবি তুললাম।

শৈলপ্রপাত এরপর অনেকটা টানা আপহিল।রোদ কম ছিল বিধায় আস্তে আস্তে আপহিলে প্যাডেল করে উঠে যেতে লাগলাম। কিছুদূর গিয়ে পানির জন্য হাপিত্যেশ করতে হল।পরে একটা বাজারে থেমে ঠাণ্ডা পানি খেয়ে নিলাম। কিন্তু সামনে যে কি বিপদ অপেক্ষা করছে কারো জানা ছিল না। দুইজনেরই ব্যাগে প্যালাইট ছিল। চিন্তা করছিলাম খুব সহজেই নীলগিরি পৌছে যাব। পানি বিরতির পরে আমি একটু সামনে এগিয়ে গেলাম। সূর্য তখন অস্তগামী প্রায়। প্যাডেল এর জোর বাড়ালাম।

আনুমানিক ৬:৩০টার দিকে ওয়াই জাংশনে আর্মির চেকপোস্টে পৌছালাম। যথারীতি হাজারটা প্রশ্ন। কই যাই, কেন যাই, কি কাজে যাই? সন্ধ্যা হয়ে গেসে আর যাওয়া যাবেনা। ৫ মিনিট পর নোমান ভাই আসল। আর রাজি করিয়ে ফেলল চেকপোস্টে কর্তব্যরত জওয়ানকে। আলো একেবারেই কমে আসছিল। কিন্তু নোমান ভাই বলল টান দে। লাইট ছাড়া যতদূর পারি চলে যাই। আমিও সেই আগ বাড়িয়ে চলতে লাগলাম। পরে দেখি নোমান ভাই আবারো পিছনে পরেছে।

চিম্বুকে এসে থামতে বাধ্য হলাম। ঘুটঘুটে অন্ধকার, সামনে কিছুই দেখা যায় না। নোমান ভাই ও পিছনে। এই থামাটাই যেন কাল হল। বিজিবির দায়িত্বরত এক অফিসার এসে পথ আটকাল। বলে আপনারা কোনমতেই যেতে পারবেন না রাতের বেলা এই রুটে। শান্তি বাহিনীর ভয়ও দেখাল। কিন্তু নোমান ভাই আর আমি নাছোড়বান্দা। আমরাও জানাই দিলাম আজকে যদি আমাদের এইখানে মৃত্যুদন্ডও দেন, তারপরো আমরা সামনে যাব। উনি পরে দুইজনের মোবাইল নাম্বার, ফ্যামিলির নাম্বার নিয়ে ছেড়ে দিলেন। আমরা দুইজনেই লাইট লাগিয়ে রাখলাম আর একসাথে আগাতে লাগলাম। ৩০মিনিট পরেই দেখি আমার লাইটের আলো নিভু নিভু। নোমান ভাই এর লাইটে সামনে যেতে লাগলাম। একটু পরেই একটা ডাউনহিলে গাছের গুটির সাথে উস্টা খাওয়া থেকে বাচলাম কোনমতে।

অন্ধকারে আচ্ছন পুরো পরিবেশ।রাস্তায় কেউ নাই শুধু আমরা দুইজন ছাড়া। ঝিঝি পোকার ডাক পরিবেশটাকে আরো ভৌতিক করে তুলল। কিছুদূর যাওয়ার পর দেখি একটা আগুন আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। আমি তো ভয়ে প্রায় মুর্ছা। নোমান ভাই সাহস দিলেন, কিছু হবে না। কিন্তু আমি প্যাডেল থামিয়ে রাস্তার পাশে দাড়াই থাকলাম।কিন্তু তারপরো দেখি আগুনটা সামনে আগাই আসিতছে। তখন সত্যি সত্যি ভয়ে কাপতে লাগলাম। পরে দেখলাম কিছু পাহাড়ি কাজ শেষ করে বাড়ি ফিরছে, আর তাদেরই কেউ ধূয়া ফুকছে। ওরাও আমাদেরকে দেখে ততমত খেয়ে গেল।

এভাবে নির্জন, থমথমে পরিবেশে আপহিল বাইতে বাইতে হাপাই উঠছিলাম। পিক৬৯ এর আগে পা যেন আর চলেই না। পানি, স্যালাইন ও ফুরিয়ে আসছিল। অবশেষে ৮:৩০ এর দিকে পিক৬৯ এর চূড়ায় উঠলাম। কিন্তু সাথে থাকা লাইট এর চার্জ ও প্রায় শেষের দিকে। তাই সামনের বাজারেই থেমে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। ৯টার কিছু পরে পৌছালাম এম্পুপাড়া বাজারে। কিছু দোকান খোলা ছিল। আমরা দোকানে গিয়ে বসলাম আর জানালাম আজ রাতে এখানে থাকতে চাই। দোকানী সানন্দে রাজি হয়ে গেল। উনার ছেলেকে দিয়ে আমাদেরকে উনার ঘরে পৌছে দিলেন। আর আমরাও মাথা গুজার টাই পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম।

পরে ২ কিমি সামনে গিয়ে খাপুপাড়ায় রাতের খাবার খেয়ে নিলাম। এদিকে ৫ মিনিট পরপর ফোন দিয়ে খোজ নিচ্ছিলেন বিজিবির ঐ অফিসার। কি অবস্থা, কোন সমস্যা নাকি? উনার নাম ছিল সোলাইমান ভাই। পরে ফোন করে বিস্তারিত খুলে বললেন। আমরাও ধন্যবাদ জানিয়ে ঘুমাতে গেলাম, শান্তির ঘুম।


# লিখেছেনঃ Sakib Mahmud
# রাইডার্সপেন বাইকট্যুর রাইটিং প্রতিযোগিতা ২০১৬

Leave a Comment