রাইডার্সপেন

জাহাজমারা আর কদ্দুর?” “ম্যাএ্যালা দূর”

দাউদাউ করে জ্বলছে আগুনমুখা নদীর খাড়াপাড় ঘেষে ছোট্ট টং দোকানের বাইরে মাটির চুলাটা। বেঞ্চিতে বসে কেটলির ধোয়ার দিকে তাকিয়ে আমার মনে হল যেন নদীরবুকেই উড়ছে ধোয়া। গরুর দুধের দু’কাপ চায়ের অর্ডার করা হয়েছে। এ-নিয়ে ৩য় দফা। খড়খড়ে ব্যালা বিস্কুট ভিজিয়ে চায়ে চুমুক দিতেদিতে অপেক্ষা করছি পানপট্টি খেয়াঘাটে। খেয়া মানে কিন্তু নৌকা না, আস্তো লঞ্চ। সরাসরি সাগরে ধাবমান এই সুপ্রসস্ত খরস্রোতা নদীতে খেয়া পাড়াপাড় চলে দোতলা লঞ্চদিয়ে।

মানচিত্রের এদিকটা দিয়ে এখানেই মূল ভূ-খন্ডের শেষ। বাকিটা জলরাশি দ্বারা বিচ্ছিন্ন। আগুনমুখা নদী পাড় হয়ে আমরা যাব নদী-সমুদ্রবেষ্টিত রাঙ্গাবালি উপজেলায়। রাঙ্গাবালির দক্ষিনে চড় মৌডুবির সমুদ্র সৈকতে শেষ হবে আমাদের অভিযাত্রা। স্ত্রী-পুত্রকে শ্বশুড়বাড়ি জমা দিয়ে চারদিন আগে বেড়িয়েছি দিচক্র ভ্রমনে। উত্তরের হালুয়াঘাট বর্ডার জিরোপয়েন্ট থেকে শুরু হওয়া যাত্রার আজ পঞ্চম দিন। উত্তর থেকে ঢাকা ভেদকরে সোজাদক্ষিণে প্যাডেল ঘোরাতে ঘোরাতে এ ক’দিনে প্যানিয়ারে জমেছে হরেক অভিজ্ঞতা।

নদী পাড় হয়ে কিভাবে কোনপথে চালিয়ে মৌডুবির জাহাজমারায় পৌছাবো তা নিয়ে কালরাতে গলাচিপার ছোট্ট দোকানটায় চলছিল চায়েরকাপে ঝড়। অতিথিপরায়ন দুইবন্ধুতো কোনপথে আমাদের পৌছানো সহজ হবে তা নিয়ে মতপার্থক্য থেকে হাতাহাতি পর্যায়ে। বেলা তিনটা পেরোনোয় আমরাও কিছুটা চিন্তিত কারণ খেয়াঘাটে এসেও স্থানীয়রা কেউকেউ জায়গার নামই চিনছে না, কারও চোখ চড়ক গাছে “মৌডুবির জাহাজমারা! হ্যাতো ম্যালা দূর, আইজ পৌছতে পারবেনইনা, আমনেরা থাকপেন কোম্মে রাইতে?” দেড়ঘন্টাব্যাপি খেয়াপাড় হতেহতে মাষ্টার কেবিনে লঞ্চের ষ্টীয়ারিং হুইল ধরে ছবিতোলা, সেলফি আর উৎসুক মানুষের প্রশ্নাবলীর হাসিমুখে জবাব দিতেদিতে আমরা খুজঁছি সঠিক দিকনির্দেশনা।

নানাজনের নানামতকে ক্যালকুলাস করে লঞ্চ থেকে নেমেই আমরা দৌড় আরেক খেয়া ঘাটের দিকে। জুতাখুলে হাতে, সাইকেল ঘাড়ে নিয়ে কাঁদায় প্রায় হাটু ডুবিয়ে ডিঙ্গি নৌকায় উঠলাম ছোট্টএকটা শাখানদী পাড় হতে। দ্বীপ উপজেলা রাঙ্গাবালির ‘মৌডুবি’ আলাদা আরেকটি চর। নৌকা মাটি ছুঁতেনাছুঁতে তরুন মাঝি মামুন লাফ দিয়ে নামলো পানিতে “আপনেগো কাদাঁ পারাইতে অইবেনা, আমার ঘাড়ে ওডেন”। “আরে নাহ! আমাগো অভ্যাস আছে” বলে নেমে পড়লো সফরসঙ্গি নিয়াজ মোর্শেদ।

খড়ে কাঁদা পরিষ্কার করে দ্রুত পায়ে জুতা ঢুকাতে ঢুকাতে জিজ্ঞেস করি- মাঝিভাই জাহাজমারা ক্যামনে যামু? কোন রাস্তায়? -হ্যাতো এদিক দিয়া সোজা একরাস্তা। হ্যায়ানে যাইবেন ক্যা! আমনেরা যাইতে যাইতেতো রাইত হইয়া যাইবে! রাস্তা খুঁইজা পাইবেননা! -কত মাইল হবে আনুমানিক? -হ্যাতো ম্যালা! আফনেগো রাইত অইয়া যাইবে। সাইকেল ঠেলে রাস্তায় উঠতে উঠতে গুগলম্যাপ দেখার চেষ্টা করলাম। জায়গার নামগুলো মার্ক করা নেই। অনেকটা ডিম্বাকৃতির দ্বীপটির একপ্রান্তে আছি আমরা। অপর প্রান্তের সাগর পাড়ে পয়েন্ট করে দেখে নিলাম প্রায় ২৬কিলোমিটার পথ।

সূর্যাস্তের বাকি চল্লিশ কি পঞ্চাশ মিনিট। অচেনা, মেঠোপথ। এই গ্রামে পৌছায়নি বিদ্যুত । যা থাকে কপালে, প্যাডাল ঘুড়তে শুরু হল। দ্রুতবেগে আমাদের অতিক্রম করে যাচ্ছে রাস্তার দু’ধারের দৃশ্যপট। একপাশে নদীর বুকে পড়ন্ত সূর্যের আলো। অন্যপাশে ঘন গাছপালা। বহুদুর পরপর তাবুরমত ঘর চোখে পড়ে রাস্তাঘেঁষে কয়েকফিট নিঁচুতে। ঘরগুলোর সামনের রাস্তাটুকুতে কোথাও গোবর শুকাতে দেয়া, কোথাও রোদে দেয়া ধান, বেলা শেষে কুড়িয়ে উঠাচ্ছে টুপরিতে। আমাদের আসতে দেখে তারা অবাক দৃষ্টি নিয়ে সড়ে জায়গা করে দেয়। ওয়াপদার করা এই মাটির বাধ পুরোদ্বীপটাকে প্রদক্ষিণ করেছে।

বাঁধের উপর চলার পথ। দুপাশে মনোরম দৃশ্য অন্যসময় হলে ধীরেগতিতে উপভোগ করতাম। এখনও উপভোগ করছি, একটু দ্রুতবেগে, নতুবা মনোরম দৃশ্য একটুপর লোমহর্ষক দৃশ্যে রুপান্তর হবে। চলতে চলতে কখনো পার হচ্ছি ঘন ঝাউবন, কখনো সরু পথ। পার হচ্ছি ঝাঁকামাথায় গ্রামের লোক “ভাই জাহাজমারা আর কদ্দুর?” সহজ উত্তর- “ম্যাএ্যালা দূর” দূরে সমুদ্রের গর্জন শুনতে পাচ্ছি। দেখতেওপাচ্ছি, ওপারে ধীরেধীরে একটা ডিমের কুসুম সাগরে ঝাপ দিচ্ছে। পথ ছেড়ে নেমে গেলাম, ক্ষেতের আইল ধরে শুকনো গাছের সাঁকো পাড়হয়ে পড়লাম বালুর পথে। ব্যার্থ চেষ্টা করে স্যাডল ছেড়ে ঠেলে এগোলাম সৈকতের দিকে।

লালকাঁকড়ার অজস্র গর্ত পেরিয়ে পেনিয়ার থেকে খুলে সৈকতের বালুতে গেড়ে দিলাম লাল সবুজের পতাকাটা। সফরসঙ্গির ছবি তুলে ক্যামেরার সামনে যেই আমি দাড়ালাম, সূর্যমহাদয় টুপকরে হারিয়ে গেলো অথৈ সাগরে। ডুবে যাওয়া সুর্যের রেখে যাওয়া তখনো কিছু পিঙ্গল আলোরপানে হাতপা ছেড়ে বসা দুই যুবক। সিগারেটের ধোয়া, পাশে ঘ্যাষাঘ্যাষি করে দাড়ানো ক্লান্ত দুটো সাইকেল। নির্জন সৈকতে সাগরের গর্জনের তালে উড়ছে লালসবুজের নিশান। হঠাৎ উঠে দাড়িয়ে “চলেন যাওয়া যাক…..” ঘুরে স্তব্ধ হয়ে গেলেন সফরসঙ্গি, আমিও ঘুরলাম- ঘুটঘুটে অন্ধকার চারিদিকে। ঐ দূরের বাধের উপর যে বড় রাস্তাটি ধরে এগিয়েছিলাম শেষ বিকেলে তা এখন বিলীন।

রাস্তা ছেড়ে সৈকতের দিকে ফসলি ক্ষেত আর সরুখাল পেড়িয়ে এগিয়েছিলাম তাও প্রায় পোয়ামাইল। এখন তার কিছুই দেখাছিনা। কোন দিকে এগোলে রাস্তা পাবো বোঝা যাচ্ছেনা। কয়েকমূহুর্ত অসীম কালোর দিকে তাকিয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় দুজন। পেছনে ভয়াল সমুদ্রের গর্জন।


# লিখেছেনঃ Shahriar Hasib
# রাইডার্সপেন বাইকট্যুর রাইটিং প্রতিযোগিতা ২০১৬

Leave a Comment