রাইডার্সপেন

সাইকেলে আমার বিশ্ব ভ্রমণের গল্প ১৯৯৬ – ১ম পর্ব

মোহাম্মদ আবু ফয়সাল খান। ৯০ এর দশকে দুঃসাহসী হয়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন । সাইকেলে বিশ্বভ্রমণের অভিপ্রায়ে। আমরা সেই সময়ের কথা বলছি, যে সময় এইরকম কোন স্বপ্নকে পাগলামী বলেই মনে হতো। তিনি আমাদের শুনিয়েছেন তার সেই সময়গুলোর ধারাবাহিক লগ। তারচোখ দিয়ে আমরা দেখতে চেয়েছি সেইসময়ের স্বপ্নপাগল একজন সাইকেলপ্রিয় মানুষের অনুভূতি। রাইডার্সপেনের পাঠকদের জন্য এবার থাকছে ১ম পর্ব। 


আমি আরিফ, শাহীন ও মোয়াজ্জেম।
সাইকেল ভ্রমন আমরা করবো এই প্রত্যয়ে সাভার স্মৃতি সৌধে আমাদের প্রথম পদচিহ্ন । প্রথমে সিদ্ধান্ত হয় যে আমি আরিফ ও শাহীন প্রথমে সার্ক ট্যুর করবো। পরে মোয়াজ্জেম আমাদের সাথে ওয়ার্ল্ড ট্যুরে যোগদান কররে।  শেষ পর্যন্ত আরিফ আমাদের সাথে সার্ক ট্যুরে যেতে পারেনি পরীক্ষার কারনে। মোয়াজ্জেম ও আরিফ একই সেশনে থাকায় আমাদের সাথে সার্ক কিংবা বিশ্বভ্রমনে কোনটাতেই যেতে পারেনি। পরে মোয়াজ্জেম অন্য একজন পার্টনার নিয়ে বিশ্ব ভ্রমনে বের হয়।

আমরা সকলেই একসাথে স্বাউটিং করতাম। আরিফ একজন সফল স্কাউট। সে প্রেসিডেন্ট স্কাউট ও প্রেসিডেন্ট রোভার স্কাউট এওয়ার্ড প্রাপ্ত।

সাইকেলে ওয়ার্ল্ড ট্যুর - রাইডার্সপেন
ছবিটি 1991 সালের মার্চ মাসের।

দীর্ঘ দিন যাবত সাইকেল ভ্রমনের চিন্তা করছি। যার সাথে কথা বলি সেই আমাকে পাগল বলে। সবার বক্তব্য আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। এস এস সি গেল, এইচ এসসি গেল। একা একা প্লেন করি। মানচিত্র দিয়ে ঘরের দেয়াল ছেয়ে ফেলেছি। ঈদের জামা কেনার টাকা দিয়ে নিউমার্কেট থেকে মানচিত্র কিনে আনি। যেটা প্রয়োজন সেটা না থাকলে দোকানে অর্ডার করে আসতাম।

মানচিত্র নিয়ে সে কি লেখা পড়া চলছে। কোন কোন বর্ড়ার দিয়ে কোন দেশে প্রবেশ করবো ইত্যাদি ইত্যাদি। মাগার পার্টনার তো দুরের কথা কারো সাথে শেয়ার করতে পারছিনা ভয়ে। ক্লাস এইট থেকেএইচ এস সি। এর মধ্যে সাত বছর পার হয়ে গেল। কিন্তু মাথা থেকে সাইকেল ভ্রমনের ভুত নামে না।

নিজের সাইকেল নেই। এলাকার দোকান থেকে সাইকেল ভাড়া করে আমাদের আশেপাশে ঘুড়ে বেড়াতাম। আমাদের এলাকার দোলান বাজারের আলী হোসেন আমার ক্লাস মেট। ওর বাবার , ভাইয়ের সাইকেলের দোকান ছিল ।সেখান থেকে সাইকেল ভাড়া নিয়ে এলাকার আশেপাশে সহ নরসীংদি পর্যন্ত ঘুরে বেড়াতাম।

তখন ফনিক্স সাইকেল বাজারের সেরা। আর কারো সাইকেল দেখলেই মাথা খারাপ হযে যেত কিভাবে ঐই সাইকেল চালানো যায়। বাড়ী থেকে সাইকেল এর কথা বললে 100ভাগ নিশ্চিত সাইকেল কিনে দিবে না। এখনকার সময়ের একলক্ষ টাকার সাইকেল কিনতে ও অনেকের বুক কাপেনা। তখন সাড়ে চারহাজার টাকার সাইকেল কিনতে ও খবর হয়ে যেত।

সাইকেলে ওয়ার্ল্ড ট্যুর - রাইডার্সপেন

আমার স্বপ্ন পুরনের যাত্রা শুরু

আমার ভাগ্য অনেক ভালো। অনার্স ভর্তি হলাম। এরমধ্যে একদিন আমার বড়ভাবীর বড়বোনের বাসা মালিবাগে গেলাম। বড়আপার বাসা থেকে বের হয়ে আসবো এমন সময় স্টোর রূমে নজর এলো। একটি ব্লু রঙ্গের রেইসিং সাইকেল( বর্তমানে রোডবাইক বলি) পড়ে আছে। গিয়ে সাইকেলটিকে বের করলাম কাউকে না জিঞ্জাসা করেই। দুলাভাই নামাজের জন্য মসজিদে যাবেন। আমাকে সাইকেল পরিস্কার করতে দেখে একটা হাসি দিয়ে জিঞ্জাসা করলেন কি করছি। দুলাভাই জানালেন সাইকেল টা আনোয়ারের( ছেলের)। ওর চাচা মালয়েশিয়া থেকে পাঠিয়েছে। সে সেটা চালায় না।

আমি বললাম দুলাভাই আমি সেটা চালাবো। দুলাভাই আনোয়ারের সাথে কথা বলতে বললেও আমি আর একমিনিট ও দেরী না করে কাধে সাইকেল নিয়ে সোজা খিলগাও রেল গেটের কাছে তালাচাবির দোকানে গিয়ে সাইকেলের লক খোলালাম। এবং একটি চাবি বানিয়ে নিলাম।

আমি এখন এখন রাস্তার হিরো। এলয় রিম, এলয় ফ্রেম, ক্রেন্ক ও এলয়। মোদ্দা কথা তাইওয়ান এর অয়েমা কোম্পানীর সম্পূর্ন এলয় একটি রোডবাইক যা মাস দুয়েক আগে মালয়েশিয়া থেকে প্লেন যোগে বাংলাদেশে চাচা তার ভাতিজার জন্য প্রেরল করেছেন।

1987 সালে ওইরকম একটি রোডবাইকের অলিখিত মালিক । কি ভাব নিয়ে সাইকেল চালাই সেটা বলা যাবেনা। কারন তখন ঢাকা শহরে হাতেগোনা কয়েকটি রোডবাইক ছিল্ । আর যাদের রোড বাইক ছিল তারা মোটা মোটি প্রফেশনাল ছিল্ সকলের নাম মনে নেই। বিটিএমসির একজনের (সম্ভবত মান্নানভাই) একটি সাইকেল ছিল ।সেটি আমেরিকা থেকে আনানো ছিল। লাল টকটকে রোডবাইক।

আনসারের দুজন (স্বামী স্ত্রী )যাদের রোড বাইক ছিলো । বিজেএমসির একজন ছিলেন। আর পুরান ঢাকার কয়েক জনের সাইকেল ছিল। মোহাম্মদ পুরে আমার পার্টনার শাহীনের । আর ছিল দোকানে দোকানে। যারা রোডবাইকের গর্বিত মালিক ছিলেন তাদের সাথে পরিচয় সেই মানিক মিয় এভিনিওতে। একদিন সাইকেলে  শেওড়াপাড়া যাচ্ছি । তখন দেখলাম মানিকমিয়া এভিনিওর সামনে বেশ কয়েকটা সাইকেল। আমিও হাজির হলাম।

এতগুলি রোডবাইক- কাহিনী তো নিশ্চয় একটা আছে। জিঞ্জাসা করলাম দাড়ী ওয়ালা হুজুরকে ( আনসার ব্যটালিয়ান এর সাইক্লিষ্ট স্বামী ) কাহিনিী কি? তিনি জানালেন রাইড হবে। সেটা কোথায়? মানিকমিয়া এভিনিওর চারিদিকে দুই চক্কর। সম্ভবত পর্যটন দিবস উপলক্ষে রাইড। লাইনে দাড়ালাম। ক্যপ , ব্যাজ পেলাম।

সাইকেলে একচক্কর দিয়ে আমি কাহিল। চন্দ্রিমা উদ্যানের ফাকা দিয়ে শটকার্ট মেরে আবার হাজির হলাম মানিক মিয়া এভিনিওতে। তখন রোড ডিভাইডার ছিলনা। ফাষ্ট হলেন সেই আমেরিকান সাইকেলওয়ালা ( ওনার নাম সম্ভবত মান্নান ছিল।) সেই মান্নান ভাইকে আমার নাম ও ফোন নাম্বার দিয়ে শেওড়া পাড়া চাচার বাসায় চলে যাই। তারপর কোন রাইড হলে মান্নান ভাই ফোন করতেন। আমি হাজির হতাম। সেই থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে ভ্রমনের পথ চলা শুরু হলো।

একটা কথা বলে রাখি এরশাদ আর্মি স্টেডিয়াম তৈরীর পর আর কোন রাইড বা কম্পিটিশান মানিক মিয়া এভিনিওতে হয়েছে বলে জানা নেই। আর আমিও কখনো আর্মি স্টেডিয়ামে যাই নাই যেহেতু আমি কোন প্রফেশনাল গ্রুপের সাথে কিংবা কোন কোম্পানীর সাথে সংযুক্ত ছিলাম না


# লিখেছেনঃ মোহাম্মদ আবু ফয়সাল খান
#
ছবি কৃতজ্ঞতাঃ  লেখক

Leave a Comment