রাইডার্সপেন

সাইকেলে স্বপ্ন বয়ে বেড়ান নিয়াজ মোর্শেদ

NIAZ MORSHED | Long Distance Cyclist  । লম্বা দূরত্বের সাইকেল আরোহী নিয়াজ একজন পুরোদস্তুর ট্রাভেল গাইড । এখন পর্যন্ত বিদেশের কমপক্ষে ২৫জন পরিব্রাজক কে নিয়ে ঘুরেছেন দেশের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত । সাইকেলে দেশ ঘুরে দেখার জন্য তিনি পাড়ি দিয়েছেন অনেক গুলো ট্যুরে। সদ্য টেন্ডেমে সম্পন্ন করা তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ এর ১১শ কিলোমিটার পাড়ি দিয়েছেন এই বছর। এছাড়া আছে আরো ৪টি Cross Country দেবার মত অভিজ্ঞতা । সমাজবিজ্ঞান থেকে গ্রাজুয়েট নিয়াজ নেপালের অন্নপূর্ণা বেইস ক্যাম্পের ট্রেকিং করেছেন বছর খানেক আগে। বর্তমানে তিনি সাইকেলে ভুটান যাবার পরিকল্পনা করছেন । নিয়াজ মোর্শেদ এর সাথে  কথা বলেছেন রাফিদুল ইসলাম চৌধুরী। জানিয়েছেন তার স্বপ্নের কথা। আমাদের পাঠকদের জন্য সেই আলাপ তুলে ধরা হলো।

নিয়াজ মোর্শেদ - রাইডার্সপেন

প্রশ্নঃ ভাইয়া আপনার নামটা কী?
উত্তরঃ আমার নাম মোহাম্মদ নিয়াজ মোর্শেদ।

প্রশ্নঃ আপনার সাইক্লিংয়ের যাত্রাটা কবে থেকে শুরু?
উত্তরঃ প্রথম যাত্রা বলতে আমি শুরু করি ২০১১ এর শেষের দিকে। মূলত ঘুরাঘুরিটা আমার নেশা ছিল খুব ছোটবেলা থেকেই। কিন্তু এই ইয়েতে সাইকেল কখনো ছিলনা। যখন বিডি সাইক্লিস্ট ঢাকা শহরে রান করা শুরু করে, তাদেরকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে আমি সাইকেল কিনি। তো সাইকেল কেনার পর ওদের সাথে অনেকগুলো রাইডে অংশগ্রহণ করি। তারপর ২০১২ দিকে আমরা কয়েকজন একটা গ্রুপের মেম্বার (ট্রাভেলার্স অব বাংলাদেশ) ঠিক করি শ্রীমঙ্গলের ভেতরে রাইড দেব। তো আমরা ট্রাকে করে ঢাকা থেকে সাইকেল এনে শ্রীমঙ্গল থেকে হাম হাম এর উদ্দেশ্যে রওনা হই। এটা ছিল দুই দিনে প্রায় ১১০ কিলোমিটারের মত। তখন এটাই আমাদেও কাছে অনেক কিছু ছিল। এই ট্যুরটা করার পরে আগ্রহটা আরও বাড়ে।

তখন একটা আত্মবিশ্বাস বাড়ে যে সাইকেল দিয়েও অনেক রকম ট্যুর করা সম্ভব। সাইকেল দিয়ে অনেক বেশি দেখা সম্ভব, মানুষের অনেক বেশি কাছে যাওয়া সম্ভব। আর স্বাধীনতাটা অনেক বেশি। আমি ইচ্ছে করলে এক জায়গায় থামতে পারছি, বসতে পারছি, কোনো সুন্দর দৃশ্য দাড়িয়ে দেখতে পাচ্ছি। যেটা বাস বা অন্য কোনো জানবাহন দিয়ে সম্ভব হয়না। ঐ কারণে আরকি আগ্রহটা আরও বাড়ে। তো ঐখান থেকে যখন ঢাকায় ফিরে যাই তারপর থেকে আসলে ধ্যানজ্ঞান হয়ে যায় ঘুরাঘুরির জন্য।

এই লাইনে আরও কিছু মানুষ আগে থেকে ছিলেন। যারা সাইকেল দিয়ে পুরো বাংলাদেশ ঘুরে বেড়িয়েছেন। উনাদের সাথে আমি যোগাযোগ করি এবং কথা বলি। তাদের মধ্যে একজন শরীফ ভাই আমার খুব ক্লোজ ফ্রেন্ড, উনার সাথেও কথা বলি। কিভাবে সাইকেল নিয়ে ঘুওে বেড়ানো যায়। উনার অনেক পরামর্শ নিয়ে আমি সাইকেল নিয়ে ভ্রমণ জন্য করার মন স্থীর করি। তারপর ২০১২ সালে কয়েকটা ছোট ছোট রাইডে যাই। ঐরকম কয়েকটা রাইড দেয়ার পর অভ্যস্থতা আসে।

আমার প্রথম বড় রাইড হচ্ছে সাতক্ষীরা-সিলেট। আসলে সবাই বলে টেকনাফ-তেতুলিয়া যাবে। তো আমরা দেশের এই মাথা থেকে ঐ মাথা। আমি শরীফ ভাই সহ আমরা ৩ জন মিলে ২০১৩ সালের রোজার ঈদে বেড় হই। জানিনা এই পথে আর কেউ গিয়েছিল কিনা? তবে আমাদের ধারণা আমরাই প্রথম এই দিকটাতে। কারণ আমরা আরও অনেককেই জিজ্ঞেস করেছিলাম। তো সবাইকে বলে কয়ে আমরাই প্রথম। এই প্ল্যানটা ছিল আমাদের অনেক আগে যখন শাহবাগে আন্দোলন শুরু হয়। কিন্তু তখন হরতাল থাকার ফলে আমরা বেড় হতে পারিনি। তারপর ঐ ট্যুরটা করি আমরা ৬ দিনে। সাতক্ষীরার ভোমলা স্থল বন্দর থেকে সিলেটের তামাবিল পর্যন্ত। সিলেটে আসার পর সিলেটের কয়েকজন সাইক্লিস্টের সাথে আমাদের পরিচয় হয়। ওরা আমাদেরকে অভ্যর্থনা জানায়। এইতো মোটামুটি শুরু।

প্রশ্নঃ এ পর্যন্ত আপনি কত কিলোমিটার অতিক্রম করেছেন?
উত্তরঃ আসলে আমি অনেকটা এ্যানালগ সিস্টেমে সাইকেল চালাই। যেমন আমার কোনো মিটার নেই। আমার ঐটা পছন্দ না। গত তিন বছরের মধ্যে আমি এ্যান্ডমন্ডো নামক সফটওয়্যার ব্যবহার করিনি। সম্প্রতি র‌্যাকিট ব্যানকিজার নামক একটি কোম্পানি বিডি সাইক্লিস্টের সাথে মিলে একটি চমৎকার উদ্যোগ নিয়ে আসে। যেটা হল চল্লিশ হাজার কিলোমিটার একটা নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে অতিক্রম করলে প্রতি কিলোমিটারে র‌্যাকিট ব্যানকিজার সেফ দ্যা চিলড্রেনকে দশ টাকা করে দেবে। এটা আমার কাছে খুব চমৎকার একটা উদ্যোগ বলে মনে হয়েছে। যদিও দশ টাকা কিছুই না। তারপরও কিছু না হওয়ার চেয়ে অনেক কিছু। এ জন্য এ্যান্ডমন্ড ব্যবহার করা শুরু করেছি। আর যেহেতু মিটার ব্যবহার করিনা তাই সিওর বলতে পারছিনা, আনুমানিক ৮/৯ হাজার কিলোমিটার হবে। আর এ্যান্ডমন্ডতে ১০০ কিঃমিঃ ছারিয়ে গেছে।

প্রশ্নঃ কতটি রাইডে অংশগ্রহণ করেছেন?
উত্তরঃ আসলে বিডি সাইক্লিস্টের সাথে প্রথম দিকে অনেকগুলো রাইডে অংশগ্রহণ করেছি। কিন্তু আমি তাদের থেকে একটু আলাদা হয়ে যাই। কারণ আমার চিন্তা ছিল আমি একটু দূরে যাই। আমার যেদিন কাজ নেই সেদিন আমি ঢাকা থেকে বেড় হই সাইকেল নিয়ে। ঢাকা থেকে দূরে। অনেক সময় তাবু নিয়ে চলে যাই। সারা দিন সাইকেল চালিয়ে কোনো এক গ্রামে অবশ্যই পরিচিত স্থানে তাবু টানিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। পরদিন সকালে সেখান থেকে নাস্তা করে আবার ঢাকায় ফিরে আসি। আমি এই রকম ভাবে রাইড দেই। এটা অন্যরকম এক মজা। আসলে সাইক্লিংটাই তো শেষ কথা নয়, আউটডোর এ্যাক্টিভিটি টাকে জনপ্রিয় করাই আমাদের উদ্দেশ্য।

আমাদের জেনারেশন থেকে হয়তোবা শুরু। আর এখনকার ছেলেমেয়েদের বলা হয় খুব বেশি আত্মকেন্দ্রিক। সবসময় ঘরের ভেতর থাকে এবং ফেসবুক আর টুইটার এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু আমার মনে হয় এরাই বেশি ঘুরতে পারে, কারণ এখন ফেসবুকের কল্যাণে ঘুরতে যাওয়া সম্ভব। এক বন্ধুকে দেখে আরও ৫ টা বন্ধু আগ্রহী হয়ে উঠবে। এটা অবশ্যই ইতিবাচক দিক। তবে এই জিনিসটার একটা নীতিবাচক দিক কিন্তু পরিবেশের ওপর প্রভাব ফেলছে। যেমন হাম হাম কিন্তু আমাদের গ্রæপের বন্ধুদেরই খুজে বাড় করা। ঐ এলাকায় যারা আদিবাসি ছিল তারা জানত। তবে এটা যখন পত্রিকা এবং মিডিয়ায় চলে আসল। তখন মানুষের যাতায়াত ঐদিকে বেড়ে গেল। এবং মানুষ ময়লা আবর্জনা ফেলে ঐ এলাকার পরিবশটাও নষ্ট করে দিল।

তবে আমাদের একটা নিয়ম আছে, সেটা হল আমরা যখন রাইডে যাই তখন একটা ময়লা টিস্যুও আমরা রাস্তায় ফেলি না। যেখানে আমরা ময়লা ফেলার স্থান পাই সেখানে আমরা ময়লা ফেলি। যেন আমাদের দেখে যেন আগামী দিনের যুব সমাজ শিখতে পারে এটা আমাদের অন্যতম মূল লক্ষ্য।
আমি যখন সাইক্লিং শুরু করেছি, আমার সাথে যারা ছিলেন তারা সবাই সিনিয়র। এখন আমি যখন রাইডে বেড় হই তখন আমি আমার থেকে জুনিয়র কাউকে নিয়ে যাই। আমি যেমন সিনিয়রদের কাছ থেকে শিখেছি, তেমনি আমার জুনিয়ররাও আমার কাছ থেকে শিখবে।

প্রশ্নঃ নতুন প্রজন্মের সাইক্লিস্টদের উদ্দেশ্যে আপনার মতামত কী?
উত্তরঃ নতুনরা তো সব সময় নতুনত্ত নিয়ে আসে। যেমন সাইকেল এক সময় ছিল একরকম, এখন আবার আরেক রকম। বাহারি ডিজাইনের সাইকেলের মেলা বসেছে।
নতুন যারা সাইক্লিংয়ে এসেছে, আসছে এবং ভবিষ্যতে আসবে তাদেরকে একটা কথাই বলব, তারা যেন হঠাৎ করে এসে হঠাৎ করে হারিয়ে না যায়। আমরা অনেকদিন যাবৎ সাইক্লিংয়ে আছি। অতীতেও দেখেছি বর্তমানেও দেখছি যে হঠাৎ করেই ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দিপনা নিয়ে সাইক্লিংয়ে এসে যোগ দেন, আবার হঠাৎ করেই সেই উৎসাহ ও উদ্দিপনা হারিয়ে যান। এটা যেন ভবিষ্যতে যারা আসবেন তাদের কাছে যেন সেটা না করেন সেই প্রত্যাশাই থাকবে নতুনদের প্রতি।

প্রশ্নঃ সাইকেলের নিরাপত্তা কি যথেষ্ট আছে বলে আপনি মনে করেন?
উত্তরঃ আসলে মটর সাইকেলের যতটা নিরাপত্তার সুযোগ আছে, বাই সাইকেলের ততটা নেই। যদি সাইক্লিং সোসাইটি কোনো স্পন্সর সাথে নিয়ে কোনো একটা জায়গায় টোকেনের বিনিময়ে রাখার ব্যবস্থা করে দেন, তবে সেটা সাইকেলেরে নিরাপত্তার জন্য অনেক ভাল উদ্যোগ হবে।

প্রশ্নঃ সাইক্লিং পরিবেশের উপর কীভাবে প্রভাব ফেলবে?
উত্তরঃ যানবাহনের কালো ধোয়া বাতাসকে দূষিত করে। আর এই দূষিত বায়ূ গ্রহণ করার ফলে মানুষ শ্বাসকস্ট সহ নানা ধরণের রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। কিন্তু সাইকেলে না লাগে পেট্রল না লাগে ডিজেল। শুধুই প্যাডেল ঘোরাতে হয়। এতে করে বায়ূ দূষণ হয় না, শব্দ দূষণও হয় না। যা পরিবেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাছাড়া সাইক্লিং স্বাস্থ্যের জন্যেও অনেক উপকারি।

প্রশ্নঃ স্কুল কলেজ গুলোতে তো বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অনেক ইভেন্ট থাকে। সেখানে সাইক্লিং রেস হলে কেমন হবে?
উত্তরঃ দিন দিন খেলার মাঠ হারিয়ে যাচ্ছে। সাইকেল রেসের জন্য কোনো মাঠের প্রয়োজন হয় না। তবে সাইক্লিং টা বাংলাদেশে অনেকটা নতুনই বলা চলে। তাই আমার মনে হয় এটা আরও পরে শুরু করা উচিৎ। এই মূহুর্তে এটা ঠিক ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে না।  তবে বিভিন্ন দিবসে আমরা যেভাবে হেটে হেটে র‌্যালি করি, তার জায়গায় যদি সাইকেল দিয়ে র‌্যালি করা হয় সেটা আরও চমৎকার হবে।

প্রশ্নঃ ভাইয়া আপনার শিক্ষা জীবন সম্পর্কে কিছু বলেন?
উত্তরঃ আমি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সমাজবিজ্ঞান বিষয় থেকে অনার্স মাষ্টার্স করেছি।

প্রশ্নঃ কোনো কর্মস্থলে যোগদান করেছেন কী?
উত্তরঃ আপাতত ট্যুরিজমের সাথে আছি। বিদেশি যারা বাংলাদেশে আসেন, তাদেরকে সাহায্য করি।

প্রশ্নঃ সাইক্লিং নিয়ে কোনো স্বপ্ন দেখেন কি?
উত্তরঃ নিশ্চয়ই। আমার বিশ্বাস যে স্বপ্নটা আমি দেখি সব সাইক্লিস্টরা একই স্বপ্নই দেখেন। স্বপ্ন দেখি একদিন বাংলাদেশের প্রতিটি রাস্তায় হাতে গোনা কয়েকটি মটর গাড়ি, রিক্সা থাকবে। বাকি সব বাহনই থাকবে সাইকেল। একদিন মানুষ বাহন হিসেবে বাই সাইকেলকেই প্রধান্য দেবে।

রাফিদঃ আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
নিয়াজঃ তোমাকেও ধন্যবাদ।


# সৌজন্য কৃতজ্ঞতা:
১। সিলেট এক্সপ্রেস
২। রাফিদুল ইসলাম চৌধুরী
৩। ফয়সাল মোহাম্মদ শান

Leave a Comment