রাইডার্সপেন

বিশ্বাসের জোরটা থাকলে সেটা ছড়াবেই


যখন কেউ ছিলো না, তখন একা ছিলাম; মার চোখে চিন্তা ছিলো, বন্ধুরহাসিতে অবিশ্বাস। এলাকার একজন একদিন বলেই ফেললো “স্ক্রু মনে হয় সব গেছে, সাইকেলের হেলমেট.. গেঞ্জির আবার বুকপকেট” স্রোতের বিপরীতে যাওয়াটা সোজা না, ভেতরে কে যেনো একজন বার বার বলছিলো “এইটাই রাস্তা…” এলাকার সব থেকে বয়স্ক লোকটা যেইদিন বললো “সাইকেল টা কিনেই ফেললাম”, সেদিন বুঝলাম “এইটাই রাস্তা.” ।তারপর একজন দুজন করে বাড়তে বাড়তে একদিন অবাক হয়ে দেখলাম আমরা অনেকজন হয়ে গেছি। বুঝলাম বিশ্বাসের জোরটা থাকলে সেটা ছড়াবেই; কারন এই বিশ্বাসের বয়স নেই, প্রফেশন নেই, জেন্ডার নেই, দিন নেই, রাত নেই। 

যারা হাসতো তারা এখন বলে -“কাজিনটা বায়না ধরেছে সাইকেল কিনবে, কি করবো বলেনতো?” মুখে বাতাসের ঝাপটা লাগলে কেমন লাগে আমরা জেনে গিয়েছি; শুরুটা কঠিন, তাই বলে তো থেমে থাকা যায় না। 

বাধা আছে সত্যি, তবে তার চেয়ে বড় “মানুষের বাধা কাটাবার শক্তি”


মোজাম্মেল হক কে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কিছু নেই। মোজাম্মেল হক এবং তার বন্ধুরা ২০১১ সালের মে মাসে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন। এটি বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম একটি সাইক্লিং কমিউনিটি। বর্তমান সদস্য সংখ্যা ৬১ হাজারের উপরে। Dutimz এর মোঃ খায়রুল বাশার সজল এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন ২০১৪ সালের জানুয়ারী মাসে। আমরা আমাদের পাঠকদের জন্য সেই সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরছি।

মোজাম্মেল হক - রাইডার্সপেন

 

আপনার জন্ম ও বেড়ে ওঠা?

ঢাকাতেই ১৯৮০ সালের ১৯ শে ফেব্রুয়ারি প্রথমে গোড়ানের দিকে থাকলেও পরে পান্থপথে চলে আসা হয়

সাইকেলের ব্যাপারটি মাথায় আসলো কিভাবে?

আসলে প্রয়োজনীয়তা থেকেই।আমার অফিস হলো মিরপুর আর বাসা পান্থপথ তো দেখা যেত যে গাড়িতে যেতে আমার ৩ ঘন্টার মত লাগত মানে সপ্তাহে আমার ১৫ ঘন্টা রাস্তাতেই কাটাতে হচ্ছে।আমাদের গড় বয়স হচ্ছে ৬৫-৬৭ বছর তো দেখা যাচ্ছে যে আমরা আমাদের জীবনের সাত ভাগের এক ভাগ রাস্তাতেই কাটিয়ে দেই।পরে আমি সময় বাচাতে মটর সাইকেলে চলাচল শুরু করি দেখা যায় তাতেও আমার ২ ঘণ্টা লাগছে।অথচ আমি যখন সাইকেলে চলাচল শুরু করলাম দেখা গেল যে আমি ৫০-৫৫ মিনিটেই যাওয়া আসা করতে পারছি সব মিলিয়ে।যার কারনেই মূলত সাইকেলে চলাচল শুরু।

অনুপ্রেরনাদাতা কে ছিলেন?

অনুপ্রেরনার কথা বললে আমি বলবো আমার অফিসের ইমিডিয়েট বস ব্রায়ান ম্যাগগ্যয়্যার ,তিনি আমাকে নিয়ে একবার নেপাল গেলেন আমি সেখানে তার সাথে সাইকেল চালালাম প্রপার মাউন্টেন বাইক বলতে যা বোঝায় আগে ঢাকা শহরে আমরা যে সাইকেলগুলো চালাতাম সেগুলো না কেননা ওগুলো ছিলো ভংগুর টাইপের ,কিন্তু মাউন্টেন বাইক অনেক মজবুত। মূলত  ওখান থেকেই অনুপ্রেরনা পাই।

বিডি সাইক্লিস্ট এর প্রতিষ্ঠা যেভাবে?

মূলত বিডি সাইক্লিস্ট প্রতিষ্ঠা হয়েছিল আমাডের রাইডগুলো অরগানাইজড করার জন্য।২০১১ সালের ১৭ ই মে মূলত প্রতিষ্ঠা হয় বিডি সাইক্লিষ্ট এর , তখন সদস্য ছিলো ২০-২২ জনের মত যার মধ্যে আমার কলিগ,বন্ধুরা ছিলেন আর এখন সদস্য সংখ্যা প্রায় ১৯ হাজার।

মোজাম্মেল হক - রাইডার্সপেন

মেম্বার হওয়ার উপায়?

তেমন কিছু নয় আমাদের ওয়েব সাইটে একটা রেজিষ্ট্রেশন লিং আছে bdcyclist.com/register এখানে যেয়ে ফরমটা ফিলাপ করতে হবে আর আমদের ফেইসবুকে গ্রুপে মেম্বার হয়ে যেতে হবে।

BDC এর কাযক্রম চালাতে কোন প্রতিবন্ধকতা?

মূলত আমরা যেহেতু রাইড দিয়ে থাকি তাই এক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা নাই কিন্তু আমি যেটা সমস্যা বলব তা হল ভালো মানের সাইকেল এবং এর দাম।আগে ভালো সাইকেল দেশে পাওয়া না গেলেও এখন মোটামুটি পাওয়া যাচ্ছে কিন্তু দাম টা বেশ বেশি ।বাইরে দু’শো ডলারে মানে ২০ হাজারের মধ্যে বেশ ভালো সাইকেল পাওয়া গেলেও আমাদের দেশে এই দামের মধ্যে তা পাওয়া যাচ্ছে না।

BDC এর কাযক্রম ………

মূলত সাপ্তাহিক কাযক্রম এর মধ্যে হলো বাইক ফ্রাইডে যেটা প্রতি শুক্রবার হয়ে থাকে এটা বিগিনার থেকে মডারেট লেভেলের জন্য এটা শুরু হয় সকাল ৬ টা থেকে প্রায় ৪-৫ ঘন্টার রাইড।আর শনিবারে দুইটা ইভেন্ট আছে একটা হল জশিলা স্যাটারডে এটা এক্সপারট দের জন্য আমরা সাধারনত ঢাকার বাইরে যাই অফরোডে।আর একই দিনে আবাহনী মাঠে আমরা বিনামূল্যে সাইকেল শেখাই।এছাড়াও প্রতি মাসের শেষ শুক্রবার আমরা সকাল ৭টায় ক্রিটিকাল মাস নামে একটা ইভেণ্ট করে থাকি এখানে আমরা সব সাইক্লিস্টদের আমন্ত্রন দেই আমরা ঢাকার ভেতরেই চালাই এই রাইডে।আর একটা রাইড হয় নাইট রাইড প্রতি মাসের তৃতীয় মঙ্গলবার রাতে ৮টায় শুরু হয় সংসদ ভবনের সামনে থেকে।

এগুলো ছাড়াও 64 good acts নাকে আমরা একটি প্রজেক্ট শুরু করেছি যেটা হলো আমরা কেবল ৬৪টি জেলাতে সাইকেলেই যাব না বরং ভালো কিছু করে আসব ওই জেলাগুলোর জন্য ইতোমধ্যে আমরা ৬ টি জেলায় গিয়েছি।

BDC এর সামনের প্ল্যান কি?

আমাদের তিনটি প্ল্যান রয়েছে প্রথমটি হলো ঢাকাকে বিশ্বেরকাছে সাইকেল নগরী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া যার জন্য ইতোমধ্যে আমরা কাজ শুরু  করে দিয়েছি।ঢাকার বাইরের জেলা শহরগুলোতে কাজ শুরু করা এবং ক্রিকেটের পর সাইক্লিংকে স্পোরটস হিসেবে জনপ্রিয় করা।

সাইক্লিং এর উদ্দেশ্য?

দেখুন সময় হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপুন কারেন্সি আপনি সাইক্লিং করলে সহজেই সময় বাচাতে পারেন এছাড়াও সাইকেল চালানোর মাধ্যমে ব্যায়ামের কাজটাও একসাথে হয়ে যায়।

আপনি যে সাইকেল দিয়ে শুরু করেন?

আমি মুলত ট্রেক ৩৯০০ দিয়ে শুরু করি ,পরে আমি রোড বাইক কিনি এবং মূলত রোড বাইক চালাতেই বেশি পছন্দ করি। আমার ফুজি,জায়ান্ট এর রোড বাইক আছে।আর স্কট এর একটা মাউন্টেন বাইক ইউজ করি।

BDC নিয়ে ভালোলাগা অনুভুতি………

আমি এটা নিয়ে যেটা বলব যে সাইক্লিং হল একটা লেভেলার দেখা গেছে যে মাল্টিন্যাশনাল কম্পানির মালিক আর তার দারোয়ান একসাথেই রাইড করছে ইন ফ্যাক্ট এটা হয়েছে যে আমার বাসার দারোয়ান সহ আরো অনেকেই ক্রিটিক্যাল মাসে গিয়েছে এক্ষেত্রে দুরত্ব কমে আসে এটাই আমাদের পাওয়া।

সাইকেল চালানোর বেনিফিট কি রকম?

সাইক্লিং এর সবচেয়ে বড় বেনিফিট আমি বলব দেহ মননে সুস্থ রাখা।আমরা অনেক সময় ডিপ্রেশন ভুগি সাইকেল কিন্তু অ্যান্টি ডীপ্রেশন হিসেবে কাজ করে ।একটা কথা আছে যে কেউ গোমরা মুখে সাইকেল চালায় না মানে মন ভালো রাখে ।এতে করে সাইকোলজিক্যাল একটা বেনিফিট পাওয়া যায়।

মেয়েদের অংশগ্রহন কেমন?

আপাতত অনুপাত হল ১০:১ ,তবে আশা করি এটা সামনে আরো বাড়বে।

BDC কে সামনে কোন অবস্থায় দেখতে চান ?

আসলে আমি বলব বিডিসি কে না মূলত আমরা চাই সাইক্লিংটা মানুষের সেকেন্ড ন্যাচারে পরিনত করতে ।বাংলাদেশ মুলত একটা ফ্লাট দেশ এখানে সাইক্লিং অনেক সহজ আরও আমরা চাই সাইকেলের জন্য আলাদা লেন থাকবে রাস্তায় ।আর সাইক্লিং টা ব্যাপকভাবে শুরু হলে ট্রাফিক জ্যাম অনেক কমে যাবে।

পুরো ব্যাপারগুলো নিয়ে সরকারের সাথে কোন আলাপ হয়েছে কি?

সরাসরি আলাপ না হলেও আমরা বেশ কয়েকটি গোল টেবিল বৈঠকে অংশগ্রহন করেছি যার মধ্যে একটা ছিল UN এর সাথে ।ডেইলি স্টারের সাথে একটা গোল টেবিল বৈঠকের কথা হচ্ছে সরকারের সাথে। তবে আমাদের কথা হল যে  এক্ষেত্রে সরকার থকে আমাদের সাথে যোগাযোগ করলে আমরা অবশ্যই সাড়া দিব এবং প্রয়োজনীয় যা করা দরকার করব ।আমাদের সাথে সেনাবাহিনী যোগাযোগ করেছে ,তারা তাদের সাইক্লিং টিম ফরম করতে চায় আমরা তাদেরকে পোস্ট ফরওয়ারড করেছি কেননা এটার একটা সরাসরি আউটপুট রয়েছে কিন্তু আমরা গোল টেবিল বৈঠক করলাম যার কোন আউটপুট নেই আমরা সে ধরনের আলোচনা থেকে দূরে থাকতে চাই।

বিদেশে যাওয়ার কোন পরিকল্পনা আছে কি?

আছে ,ট্যূর ডি এশিয়া নামে একটি রাইড হওয়ার কথা এটা থাইল্যান্ড,মালয়শিয়া,সিঙ্গাপুর মিলে হওয়ার কথা ।এটা যদি হয় তাহলে আমরা সেখানে যাব এ বছর না পারলেও সামনের বছর  থেকে ইনশাআল্লাহ যাব ।এজন্য আমাদের টিম বিডিসি নামে একটা ট্রেনিং গ্রুপ আছে ওখানে আমরা প্রাকটিস শুরু করেছি।

নতুন যারা সাইকেল কিনতে চাচ্ছে তাদের জন্য আপনি কি বলবেন?

নতুন যারা কিনতে চাছে তাদের জন্যে আমাদের ডিরেক্ট রিকমেণ্ডেশন হল যে অনেকেই জানে না যে আমাদের বিডি সাইক্লিং এর যে ওয়েব সাইটটি আছে সেটা  খুবই তথ্যবহুল ।এছাড়াও আমাদের ওখানে একটা ইন্টার অ্যাক্টিভ চারট আছে যেখানে গিয়া আপনি বলবেন আপনি কি ধরনের রাইড পছন্দ করেন এবং আপনার বাজ়েট কত আপনি ছেলে নাকি মেয়ে তাহলে আপনাকে এক্সাক্টলি কয়েকটা বাইকের চয়েস দিয়ে দিবে। এরপরেও সমস্যা হলে আপনি কোয়েশ্চেন এন্সার প্যানেলে যোগাযোগ করলেই হবে।

সাইক্লিং এর বাইরে আপনি এখন কি করছেন?

আমি বাই প্রফেশন একজন সফটওয়্যার ডেভেলপার আমার একটা  সফটওয়্যার কোম্পানি রয়েছে।আর আমার আরো একটা অরগানাইজেশন আছে ছবি ডট নেট যেটা ফটোগ্রাফি নিয়ে কাজ করে মূলত ওয়েডিং ফটোগ্রাফি ।এছাড়াও ক্যাফে সাইক্লিস্ট নামে যে সাইকেল ফিক্সিং জোন রয়েছে আমি তার একজন পারটনার।

আপনার ব্যস্ততার মাঝ থেকে আমদের সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ……

আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ।


# সাক্ষাতকারগ্রহন ও লিখন  : মোঃ খায়রুল বাশার সজল
# পূর্ব প্রকাশ ও কৃতজ্ঞতা: Dutimz , online newspaper of Dhaka University
# ফটোগ্রাফ: মোজাম্মেল হক
# শুরুর কথা কৃতজ্ঞতা: গ্রামীণফোন
# ভিডিও নির্মাণ প্রতিষ্ঠান কৃতজ্ঞতা: গ্রামীণফোন
# গ্রামীণফোনের মূল ভিডিও লিঙ্ক:https://www.youtube.com/watch?v=1d_XKe8moCY
# মূল ভিডিওর প্রধাণ চরিত্র: মোজাম্মেল হক; প্রতিষ্ঠাতা, বিডিসাইক্লিষ্টস