রাইডার্সপেন

মৌডুবি থেকে আগুনমুখা নদীর তীর ধরে কাটাখালির পথে আমরা

মৌডুবির জাহাজমারার সমুদ্রসৈকতে ডুবন্ত সূর্য সাক্ষিতে অভিযানের প্রথমভাগ শেষ করে আমরা রওনা করেছি এই দ্বীপেরই কাটাখালির উদ্দেশ্যে, আমাদের সাইক্লিষ্ট বন্ধু ও ছোটভাই শাওন এর গ্রামের বাড়ি। বিদ্যুতবিহীন এই দ্বীপের ঘুটঘুটে অন্ধকারে সম্পূর্ন অজানা অচেনা মেঠোপথ ধরে এগোচ্ছি আমরা। পথনির্দেশনায় প্রথমেই শুনেছি “কাডাখালি যাইবেন এই রাইতে! হ্যাতো দশ পোনরো মাইলতো অইবেই, কাডাখালি যাইবেন কার বাড়ি?”

নির্জন বেরিবাধ ধরে এগোচ্ছি পেছনে ফেলে সমুদ্রের গর্জন, পথের বাম পাশে সুবিশাল সমুদ্রগামী আগুনমুখা নদী। ঝিঁঝির ডাক, ক্লান্ত সাইকেলের ফ্রীহুইলের মৃদু শব্দ আর আকাশ ভরা তারা। উপভোগ করার জন্য পথের পাশে সাইকেলদুটো পরষ্পরের সাথে হেলান দিয়ে দাড় করিয়ে নদীমুখ করে বসে রইলাম কতক্ষণ। (শাওনের বাবার) আঙ্কেলের ফোন, অচেনা জায়গায়- কোথায় আছি এখন! কতক্ষণে পৌছাবো, বাড়িতে কাকী আমাদের চিন্তায় আর অপেক্ষায় বিশাল পসরা সাজিয়ে বসে আছে। টের পেলাম শুন্যপেটে ইদুর দৌড়োদৌড়ি।

আবার চাকা গড়াচ্ছি, দূরে গভীর নদীতে প্রায় ১৫-২০টা মাছ ধরার নৌকার তীব্র বাতি। খেয়াল করলাম মাঝেমাঝেই এরা বাতি ব্লিংক করে। একবার থেমে মজা করে আমাদের সাইকেলের হেডলাইট নদীর দিকে তাক করে ব্লিংক দিলাম, সাথে সাথে নৌকাগুলো থেকে ব্লিংকিং রিপ্লাই! মজা পেয়ে আরো করেকবার দিলাম, হঠাৎ খেয়াল করলাম প্রায় সবগুলো বাতি বেশ গতিতে তীরের দিকে ধেয়ে আসছে। আমরা কি তাহলে না বুঝে তাদের কোন বিশেষ সংকেত দিয়ে ফেল্লাম! আমাদের আর পায় কে, এব্রোক্ষেব্রো পথে যতটুকু পারা যায় গতিতে টান দিলাম। মাঝে নিয়াজ ভাইর হেডলাইট গেল টুপ করে বন্ধ হয়ে, এক লাইটে দুজন টানতে লাগলাম, আঁকাবাকা পথে হঠাৎ হঠাৎ গর্ত, অন্ধকারে হঠাৎ চাকা গর্তে পড়ছে, উঠছে… মাইল পনের এসেছি বোধহয় কিন্তু পথ যেন শেষ হবার নয় আজ রাতে।

একজায়গায় এসে রাস্তা দুভাগ হয়ে ডানে গ্রামের ভিতরে ঢুকে গেছে, কোনটা ধরবো আমরা! জিজ্ঞেস করার জন্য মানুষ এমনকি একটা কুকুরও চোখে পড়েনা। আঙ্কেলকে ফোন দিলাম বারকয়েক, না ধরায় আমরা বেরিবাধের সোজা পথই বেছে নিলাম, যতক্ষনে তিনি কলব্যাক করলেন, আমরা পৌছালাম একটা বাজারে। ভাই এই বাজারের নাম কি?
-ক্যালাবুইন্যা
-আঙ্কেল আমরা ক্যালাবুইন্যা বাজারে
-বেশি চলে আসছি কয়েক কিলো!!

ঐ ফ্যালাবুনিয়া বাজারের ভিতরের একটা পথ ধরে উল্টো কয়েককিলো চালিয়ে একটা টং পেলাম যিনি দূউরে উকিল সাহেবের বাড়িটি দেখাতে পারলেন।

ঘর থেকে খানিকদুরে তালগাছ তলায় টিউবওয়েলের ঠান্ডা পানিতে রামগোসল, আর আন্টির হাতের এত্ত এত্ত মজার রান্না। আহা! অচেনা দুটো ছেলের জন্য তার এত আয়োজন, আপ্পায়ন আর আন্তরিকতা আমি কখনো ভুলবোনা।

দারুন ঘুম শেষে পাখির ডাকে মুখর এক ভোরে-
শাওনের ৬বছর বয়সী এক কাজিনের সাথে গল্প, আন্টির এত্তগুলো নাস্তা খেয়ে আর দোয়া নিয়ে রওনা দিলাম আমাদের এ যাত্রার দ্বিতীয় অভিযানের উদ্দেশ্যে__


# লিখেছেন: শাহরিয়ার হাসিব। ক্রসকান্ট্রি এই ট্রিপে তার সঙ্গী ছিলেন আমাদের সবার পরিচিত নিয়াজ মোর্শেদ

১ thought on “মৌডুবি থেকে আগুনমুখা নদীর তীর ধরে কাটাখালির পথে আমরা”

  1. Pingback: ক্রসকান্ট্রির ডায়েরী থেকে; শিবচর থেকে বরিশাল - রাইডার্সপেন

Leave a Comment