রাইডার্সপেন

টেকনাফ থেকে কলকাতা – দুই চাকায় পাড়ি দিলেন ৮০২ কিলোমিটার

‘রাইডটা অনেক সহজ ছিলো। বেশ ভালোভাবেই শেষ হয়েছে। কিন্তু একা সাইক্লিং করে পুরো পথ পাড়ি দেয়াতেই ছিলো কষ্ট। একা দিনগুলো সঙ্গীবিহিন সময় কাটিয়ে পুরো রাইড শেষ করতে হয়েছে।’ এভাবেই টেকনাফ থেকে কলকাতা পর্যন্ত নিজের  ৮০০+ কিমি রাইডের গল্প বলছিলেন সাকিব মাহমুদ।

বিজয়ের মাসে দিনটিতে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে, এক তরুণ তখন টেকনাফ থেকে রওনা দিয়েছেন কলকাতার উদ্দেশ্যে। ৮০২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে চান একা সাইকেল চালিয়ে। ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যে ৩০ লক্ষ মানুষ শহীদ হয়েছেন, তাদের প্রতি আমরা সবাই শ্রদ্ধা জানাই। কিন্তু  যুদ্ধে মিত্রবাহিনীর যে ভারতীয় সৈন্যরা শহীদ হয়েছিলেন, তাদের কথা আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। আমার উদ্দেশ্য ছিলো, আমাদের দেশের শহীদদের পাশাপাশি বাংলাদেশি হিসেবে সেসব ভারতীয় সৈন্যদের প্রতিও শ্রদ্ধা জানানো।’ বলেন সেই সাইক্লিস্ট।

সেপ্টেম্বরের কোন একদিন হঠাৎ করেই এই ভাবনা জাগে সাকিব মাহমুদের মনে। ভেবে চিন্তে শুরু করেন প্রস্তুতি। ৬ ডিসেম্বর সকালে তিনি যাত্রা শুরু করেন টেকনাফের জিরো কিলোমিটার থেকে। প্রথমদিন টেকনাফ থেকে পৌঁছান কক্সবাজারে। সেখানে এক ছোট ভাইয়ের গ্রামের বাড়ি মহেশখালীতে রাত্রিযাপন করে পরদিন আবার রওনা হন।

টেকনাফ থেকে কলকাতা – দুই চাকায় পাড়ি দিলেন ৮০২ কিলোমিটার; উদ্দেশ্য বিজয় দিবসে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন

৭ ডিসেম্বর কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামে এসে পৌঁছান চকবাজারে নিজের বাসায়। সেদিন বাসায় থেকে সবার সাথে দেখা করে পরদিন চলে যান চাঁদপুর। “চাদপুরে কারো বাসায় থাকিনি। হোটেলে ছিলাম। তবে স্থানীয় কয়েকজন ছোটভাই সাহায্য করেছিল”, জানান সাকিব। চাঁদপুর থেকে মাদারীপুর পৌঁছে ফেসবুকের মাধ্যমে পরিচিত এক বন্ধুর মাধ্যমে থাকার বন্দোবস্ত হয় গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এর হলে।

চতুর্থ দিন চাঁদপুর ছেড়ে আবারও গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন সাকিব। চাঁদপুর থেকে গোপালগঞ্জে পৌঁছলে কথা হয় এক ছোট ভাইয়ের সাথে। গোপালগঞ্জে বঙ্গবন্ধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সে ছাত্রের ছাত্রাবাসে রাত কাটান। পরদিন যশোরে পৌঁছলে থাকার জায়গা না পেয়ে রাতে একটি হোটেলে ওঠেন।

ষষ্ঠ দিন ১১ ডিসেম্বর যশোর থেকে কলকাতার বর্ডার পার হন সাকিব। যশোর দিয়ে বেনাপোল বর্ডার, ২০১৪ সালে পরিচিত জুয়েল হাসান মুর্শিদাবাদ এ বাড়ি। চন্দন বিশ্বাসের বাড়ি বারাসাতের হৃদয়পুরে। উনি মূলত লং ট্যুরার + মাউন্টেইনার। উনার বাসায় ৩ দিন ছিলেন।  ৮০২ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে অবশেষে ছয় দিনে গন্তব্যে পৌঁছান এই তরুণ সাইক্লিস্ট।

কিছুটা দুঃখজনক ছিলো যে, কলকাতায় কোন সাইক্লিস্ট ক্লাব তাকে সাদরে গ্রহণ করেনি। বা সংবর্ধনা দেয়নি। তবে কলেজ স্ট্রিট এর অভিযান পাবলিশার্স এর পক্ষ থেকে বই উপহার আর প্রীতিভোজ আর আয়োজন করেছিল।  অনেক পরিচিত সাইক্লিস্টরা অপেক্ষা করছিলেন তার জন্য। তাকে পেয়ে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন সবাই।

কলকাতার সাইক্লিস্টদের কাছ থেকে সাকিবের কথা জানতে পারেন কলেজ স্ট্রিটের এক প্রকাশক। মারুফ হোসেন নামের সেই প্রকাশক এর আগে চট্টগ্রামে বেশ কয়েকবার গ্রন’বিপণি বাতিঘরে আসায় বাংলাদেশ সম্পর্কে বেশ ভালো ধারণা ছিলো। সাকিবের উদ্দেশ্য জানতে পেরে তার ‘অভিযান পাবলিশার্স’ থেকে সাকিবকে সংবর্ধনা দেন। নিজের বাসায়ও একদিন দাওয়াত করে নিয়ে যান তাকে। কলকাতায় থেকেই তিনি উদযাপন করেন বিজয় দিবস।

পরিচিত থাকলেও প্রথম দুইদিন অনেক সময় চলে যায় হোটেল খুঁজে পেতে। কোনো বাংলাদেশিই পরিচিত ছিলো না, যার বাসায় থাকতে পারেন সাকিব। প্রথমদিন এক ফেইসবুক বন্ধুর বাসায় থাকলেও দ্বিতীয় দিন কলকাতার নিউ মার্কেটে একটি হোটেলে ওঠেন।
এর আগে ২০১৪ সালে কলকাতা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত একটি সাইকেল রাইডে চন্দন বিশ্বাস নামে এক সাইক্লিস্টের সাথে পরিচয় হয়েছিলো তার। মুর্শিদাবাদের সেই বন্ধু কলকাতায় পৌঁছার তৃতীয় দিন সাকিবকে সিরাজুদ্দৌলা রোডে নিজের বাসায় নিয়ে যান। সেখানে আরও দুইদিন থেকে কলকাতা শহর ঘুরে দেখেন তিনি।

‘রাইডটা অনেক সহজ ছিলো। বেশ ভালোভাবেই শেষ হয়েছে। কিন’ একা সাইক্লিং করে পুরো পথ পাড়ি দেয়াতেই ছিলো কষ্ট। একা দিনগুলো সঙ্গীবিহিন সময় কাটিয়ে পুরো রাইড শেষ করতে হয়েছে।’ নিঃসঙ্গ যাত্রা ছাড়া নিজের উদ্দেশ্যের কারণে অভিযানটি উৎসাহের সাথেই শেষ করার কথা জানান সাকিব। ১০ দিন কলকাতা সফর শেষে ফিরতি পথে কলকাতা থেকে বাসেই চট্টগ্রাম পৌঁছান সাকিব। ২০ তারিখ আবার বর্ডার পার হয়ে ২১ ডিসেম্বর বাংলাদেশে পৌঁছান তিনি। এবার একদিন পরেই পরিবার ও সব বন্ধুদের মাঝে ফিরে আসেন তিনি।

সাকিব পড়াশোনা করছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগে। সম্মান শেষ বর্ষের এই শিক্ষার্থীর পরবর্তী লক্ষ্য, ভারতের হিমাচল প্রদেশে পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু রাস্তায় সাইক্লিং করা। ২০১৭ সালের জুলাইয়ে তিনি আবারো বেরিয়ে পড়বেন পরবর্তী রাইডের উদ্দেশ্যে।