রাইডার্সপেন

ক্রসকান্ট্রির ডায়েরী ; শিবচর থেকে বরিশাল

শাহরিয়ার হাসিব  আমাদের শুনিয়েছেন এক চমৎকার ক্রসকান্ট্রির একদিনের গল্প। এই ট্রিপে তার সঙ্গী ছিলেন নিয়াজ মোর্শেদ। শিবচর থেকে বরিশালের সেই গল্প আমরা আপনাদের জন্য তুলে ধরছি শাহরিয়ার হাসিবের ক্রসকান্ট্রির ডায়েরী থেকে।


নাস্তারপর কিলো তিন আঁকাবাকা কাঁচাপাকা সরুপথ পেড়িয়ে আমরা একটা বড় রাস্তায় এসে উঠলাম। গুগলম্যাপে এই রাস্তার নাম শরিয়তপুর রোড- দেখে নিলাম। আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য জাজিরা হয়ে শরিয়তপুরের দিকে আগানো।

তার প্রায় ঘন্টাদেড়েক আগেই আমরা আমাদের গতরাতের জরজীর্ণ আশ্রয়স্থল হোটেল আরিফ থেকে চেক আউট করেছি বরিশালে উদ্দেশ্যে। সাইকেলগুলো হোটেলের পিছনে একটা সরু বারান্দায় কোনরকম আটোসাটো করে রাখা গিয়েছিল। ঢাকা থেকে দুপুরের অনেক পরে রওনা দিয়ে শিবচর পৌছাতে আমাদের বেশ রাত হয়ে যায় কাল। আসছে বিজয়দিবসের সতর্কতার জন্য উপজেলা ডাকবাংলোয় থাকার অনুমতি মেলেনি, অমন গভীর রাতে যে কয়টা হোটেলে রুম পেলাম তারমধ্যে তিনফিট ব্যাসের গোলাকার ছিদ্রের মশারিযুক্ত হোটেল আরিফ ই সেরা মনে হয়েছিল।

শিবচর থেকে বরিশাল যাবার বহুলব্যবহৃত পথটি ভাঙ্গা- মাদারিপুর- কালকিনি হয়ে সরাসরি বরিশাল শহরে চলে গিয়েছে। আমরা কিছুটা ঘুরপথে হাইওয়ে ট্রাফিক এড়িয়ে একটি ভিন্ন রুট বেছে নিয়েছি। সকালে উঠে ট্রিপমেটের ঘুম ভাঙ্গার আগেই আশপাশটায় হেটে এলাম। শীত এসে গিয়েছে, হালকা কুয়াশায় ঢেকে আছে শিবচর খাল। হোটেলের সামনে ছোট্ট ব্রীজে দাড়িয়ে মোবাইল ক্যামেরায় জীবনবৈচিত্রের কিছু স্মৃতিও বন্দি করে নিলাম। রুমে ফিরে এসে দেখি ট্রিপমেট উঠে গিয়েছে। প্রস্তুত হয়ে সাইকেল নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম দুজনে। আজকের প্রত্যাশিত গন্তব্য ১৩০+ কিলো দুরের বরিশাল শহর হলেও আমাদের কোন তাড়া নেই। চারপাঁচ কিলো পর থেমে পেটপুরে সকালের নাস্তা করে নিলাম, সাথে রসগোল্লাতো ছিলোই।

জাজিরা পার হতেই বুঝলাম ট্রিপমেটের এই অসচারচর পথটি বেছে নেয়াটা কতটা বুদ্ধিদীপ্ত হয়েছে। রাস্তার দুপাশে বড়বড় গাছের ছায়া, ফুরফুরে বাতাস, দুপাশে খোলা প্রান্তর। আর বড়গাড়ি নেই বললেই চলে। অসাধারন এক দ্বিচক্রানন্দে আমরা দুজন প্রায় উড়ে চললাম।

দুপুর নাগাদ প্রাথমিক গন্তব্য শরিয়তপুরের বিসিক এড়িয়া পাড় হয়ে গিয়েছি, কয়েককিলো ধরে ক্ষুধানিবারনের জন্য জায়গা খুঁজে যাচ্ছে ঘুরন্ত প্যাডেলগুলো। প্রেমতলা বাজারেও কিছু পেলামনা। অবশেষে একটা টং এ বসে রুটি কলা বিষ্কুট আর সাইক্লোন সেন্টারের টিউবওয়েলের পানি দিয়ে লাঞ্চ সেড়ে নিলাম। বেশিক্ষন টিকলোনা, ঘন্টা দেড়েকের মধ্যে গোসাইরহাটের ইদিলপুল পাইলট ষ্কুলগেটে খালি ভ্যানের উপর বসে হাতপা ছুড়ে গোটাকয়েক গরম সিঙ্গারা-পুরি গিলে নিলাম আবার।

সূর্য হেলে পড়েছে পশ্চিমাকাশে। সত্তর কিলো পাড়ি দিয়ে আমরা তখন আড়িয়াল খাঁর পাড়ে পাড়ি দেবার অপেক্ষায়। আড়িয়াল খাঁ পাড়ি দিয়ে যখন বরিশাল বিভাগের মুলাদি জেলায় পদার্পণ করি তখন আধার পুরোপুরি নেমে গিয়েছি। খেয়া ঘাটের কাছেই একটা বাজারে নাস্তা করে নিতে নিতে দুটো জাতীয় পতাকা সেলাই করিয়ে নিলাম নাস্তার দোকানের পাশের দর্জির হাতে। স্থানীয়দের সাথে আলাপকালে জানলাম- কিলো তিরিশ দুরে ফেরিঘাটে সন্ধার পরপরই ফেরি বন্ধ হয়ে যায়, তবে রাত ৯টা পর্যন্ত পাড়াপাড়ের জন্য ইঞ্জিনবোট পাওয়ার আশা করা যায় কিছুটা। হাতে সময় দুঘন্টারও কম। আমাদের পরিকল্পনা হল- না পেলে এপাড়েই থেকে যাব আজকের রাতটা। ওদিকে আমার বরিশালের বাড়িতে আব্বা ইতিমধ্যে জানিয়েও দিয়েছে আমরা আসছি ঢাকা থেকে! সাইকেলে! টর্চের আলোয় আমরা ছুটছি মুলাদির এক প্রান্ত থেকে অন্য আরেক অচেনা প্রান্তে।

পূর্ব মীরগঞ্জ ফেরি ঘাট। ঘুটঘুটে অন্ধকার। একটা ট্রলার বালিরঘাটে ভিড়লো, এটাই ছেড়ে যাবে আবার। মোক্ষম সময়ে উপস্থিত হয়েছি। গাদাগাদি করে জনা চল্লিশেক লোক আর গোটা ছয়েক মটরসাইকেলের ভীরে এই বোটে এতবড় নিকশকালো আড়িয়াল খাঁ পাড়ি দিতে আমার গা ছমছম করছিল। তবে কাপছি আমি নদীর প্রচন্ড শীতল বাতাসে।

নদী পাড় হয়ে মীরগঞ্জের পিচঢালা পথে খানিক এগোতেই দুর থেকে চোখে পড়লো সারিসারি সার্চলাইট। আরো এগিয়ে বুঝলাম আমরা বরিশাল বিমানবন্দরের রানওয়ের সাথেই এগোচ্ছি। বুকের ছাতি যেন ফুলে উঠলো, চলেইতো এসেছি। দেখতে দেখতে বরিশাল ক্যাডেট কলেজ, বিএম কলেজ পার হয়ে নতুনবাজার। আমার ভিতরে কি যেন একটা জয়লাভ করার আনন্দ। একটা সুপ্ত ইচ্ছা ছিল সাইক্লিং করে নিজগ্রামে যাব। আমি বরিশালের ছেলে হলেও, দেশ বিদেশ তন্নতন্ন করা প্রথিতযশা সাইক্লিষ্ট সফরসঙ্গি নিয়াজ ভাই আমার চেয়ে দশগুন বেশি বরিশালের পথঘাট চেনে, তবুও বাকি পথটুকু আমিই আগেআগে উড়ে চললাম। ঢাকাতে বড় হওয়ায় নিজ গ্রামে আমি প্রায় অচেনা, তবুও এই পথ, চেনা বাঁকগুলো সারাদিনের শতকিলোউর্ধ্বো সাইক্লিং এতটুকু ধকল অনুভব করতে দিলনা।

রাতের খাবার খেয়েই খানিক হেটে কয়েকজন আত্বীয় আর শৈশবসঙ্গিরদের সাথে সময় কাটিয়ে এলাম।  কাল খুব ভোরেই ছেড়ে যাব, সাগরের কাছাকাছি ভুখন্ডের সীমারেখায়; গলাচিপার পথে…


# লিখেছেন: শাহরিয়ার হাসিব। ডিসেম্বর ২০১৫ এর এক বাইসাইকেল ক্রসকান্ট্রির একাংশ থেকে। এই ট্রিপের আরো লেখা পড়তে ক্লিক করুন

Leave a Comment